খাদ্যের গুনাগুণ, রোগ-প্রতিরোধ

কোন মশলার কী উপকারিতা?

কোন মশলার কী উপকারিতা?

প্রীয়তি বেশ দারুণ রান্না করে। ভর্তা ভাজি থেকে শুরু করে বিরিয়ানি বা কাচ্চি যেকোন রান্নায় তার জুড়ি মেলা ভার। তবে কেনো যেনো কারও বাসায় গিয়ে রান্না করলে সেই স্বাদটা ঠিক ঠাক আসে না। সেই একই সব উপকরণ ব্যবহারের পরও রান্নার এই গড়মিল কোথায় তা নিয়ে বেশ ভাবনা চিন্তা আর কোন মশলার কী উপকারিতা?  তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে বের করে ফেললো আদতে রান্নার আসল কারসাজি; যে লুকিয়ে থাকে ব্যবহৃত মশলা আর রাঁধুনির হাতের জাদুতে। ব্যবহৃত মশলা যদি গুণগত মানে সেরা না হয় তবে কিন্তু সেই রান্নায় তৃপ্তি মেলে না। আর গুণগত মানে সেরা মশলা মানে চাই বিশুদ্ধ মশলার ব্যবহার। তবেই না আসবে রান্নার সেই মনমাতানো আসল স্বাদ। 

 

স্বাদ বাড়ানোর জন্য আমরা সবাই খাবারে মশলার ব্যবহার করে থাকলেও এইসব মশলার যে ভিন্ন ভিন্ন স্বাস্থ্য গুনাগুণ রয়েছে তা আমাদের অনেকেরই অজানা। অনেকে বলে থাকেন যারা রান্নার কাজে যুক্ত থাকেন তাদের রোগ সংক্রমণের সম্ভাবনা খানিকটা কম। অদ্ভুত শোনালেও এর পিছনে যুক্তি হিসেবে দাঁড়া করানো হয় মশলার চমৎকার সব স্বাস্থ্য গুণের কথা। কেননা রাঁধুনি শুধু রান্নাই করেন না, বরং প্রতিনিয়ত মশলার আশেপাশে থাকায় তার নির্যাস কোন না কোনভাবে গ্রহণ করে থাকেন। ফলে কিছুটা হলেও তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ত্বরান্বিত করেন বলেই অনেকের ধারনা। 

এই ধারনা সত্যি হোক বা না হোক, তবে আসলেও আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের মশলার রয়েছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ চমৎকার কিছু গুণাগুণ। সেগুলো সম্পর্কে জানার আগে একটু জেনে নেই যে মশলা বলতে আমরা ঠিক কোনগুলোকে বুঝাই এবং কোন মশলার কী উপকারিতা?  

 

মশলা হল এমন একটি উপাদান যা বিভিন্ন বীজ, শিকড়, ফল, বাকল, সবজি এবং অন্যান্য উদ্ভিদ থেকে তৈরি হয়। এগুলো মূলত রন্ধনশিল্পের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। খাবারের স্বাদ এবং রঙ বৃদ্ধিতে মশলার বিকল্প নেই। মশলা ছাড়া যেকোনো সুস্বাদু খাবারও যেনো পানশে মনে হয়। মশলার একটি ভাল গুণ হচ্ছে এটি একটি শুকনা পদার্থ যা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হলে সহজে নষ্ট হয়না, অপচনশীল এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার উপযোগী। 

 

অনেক মশলা রয়েছে যা বিভিন্ন সংক্রমণের সঙ্গে যুদ্ধ করে শরীরকে রক্ষা করে। দেহের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, প্রদাহ কমাতে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ করতেও ভূমিকা রাখে। আবার কিছু কিছু মশলা ওজন হ্রাস, সক্রিয়তা বৃদ্ধি, হাড়কে শক্তিশালীকরণ, রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, হরমোনের সামঞ্জস্য বজায় রাখার মতন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করে। এগুলোতো গেলো সার্বিকভাবে মশলার কার্যকারিতা। এবার তবে কোন মশলার কী উপকারিতা?- তা জেনে নেওয়া যাক। 

মৌরি বীজ

মৌরি এমন একটি মশলা উপাদান যা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি এটি আলসার ও হজমজনিত যেকোন সমস্যা সমাধান করে। এতে রয়েছে ভিটামিন, লোহা, পটাসিয়াম, তামার মতন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। একই সাথে এটি ক্যান্সারের বিরুদ্ধেও চমৎকার কাজ করে। বলা হয়ে থাকে দুগ্ধদানকারী মায়ের জন্য মৌরি বীজ ভীষণ উপকারী। 

 

তেজপাতা

সারা বিশ্বে এটি খুব জনপ্রিয় মশলা। এই মশলাটি টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এতে ক্যান্সার প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও রয়েছে। পাশাপাশি গ্যাস্ট্রিক সমস্যা নিরসনে এবং কিডনির পাথর প্রতিহত করতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে এই মশলাটি। তাছাড়া দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে এটি চমৎকার কাজ করে। 

 

গোল মরিচ

ছোট কালো রঙের গোলাকার এই মশলাটি বহুল ব্যবহৃত একটি মশলা। এতে রয়েছে অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণাবলি। প্রদাহ কমানোর পাশাপাশি এটি ক্যান্সারের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তুলে। গোল মরিচ কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে ভূমিকা রাখে।

 

এলাচ

হালকা মিষ্টি স্বাদের সুগন্ধি এই মশলা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টিইনফ্লামেটরি গুণাগুণ বিশিষ্ট। এটি আলসার প্রতিহত করা সহ হজমজনিত সমস্যা সমাধানে বেশ ভালো কাজ করে। পাশাপাশি রক্তচাপ কমানো, রক্তের শর্করা মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রস্রাবের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। একই সাথে এটি মুখের দুর্গন্ধ দূর করে এবং দাঁত ক্ষয় রোধ করে। 

দারুচিনি

দারুচিনি মূলত দারুচিনি গাছের বাকল। হালকা মিষ্টি ও ঝাঁঝালো স্বাদ যুক্ত এই মশলা প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টযুক্ত। প্রদাহ কমাতে, ব্যথা ও সংক্রমণ দূর করা, অতিরিক্ত গ্যাস কমাতে দারুচিনি খুবই কার্যকর। এটি বুদ্ধির বিকাশ, হাড় গঠন, ক্যান্সার প্রতিরোধ এবং চোখের ও ত্বকের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা করে।

 

লবঙ্গ

এই মশলাটি আমরা বিভিন্ন খাবারের স্বাদ বাড়াতে ব্যবহার করে থাকি। এই মশলাতে রয়েছে নানা গুনাগুন। লবঙ্গ ক্যান্সার প্রতিরোধ এবং হাড়ের স্বাস্থ্য সংরক্ষণের জন্য ভাল। এছাড়া সর্দি কাশি উপশমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

 

জিরা

জিরা একটি অত্যন্ত উপকারী মশলা উপাদান। এতে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি গুণাগুণ। এটি হজম উন্নতিতে সাহায্য করার পাশাপাশি শুক্রানু বৃদ্ধি, হাড় মজবুত করতে, দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে এবং বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা করে। জিরার একটি অন্যতম উপকারিতা হলো এটি নিম্ন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে। এছাড়াও জিরা রক্তের কোষ বৃদ্ধি করে এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

মেথি বীজ

মেথি এশিয়া মহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় মশলা। এটি রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। দুগ্ধদানকারী মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এছাড়া মেথি হজমশক্তি উন্নতি এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে, কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দিতেও সহায়তা করে।

 

রসুন

রসুন একটি বহুগুণ বিশিষ্ট মশলার নাম। খাবারের অনন্য স্বাদ যোগ করার জন্য ব্যবহৃত একটি চমৎকার মশলা। এটি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভূমিকা রাখে। সাধারণ ঠান্ডা এবং কাশি দূর করতেও সাহায্য করে।

 

আদা

আদা সাধারণত হজম ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করার জন্য বেশি পরিচিত। আদা একটি মশলা যা ক্যান্সার প্রতিরোধ, ক্ষুধা বৃদ্ধি, এবং শ্বাস প্রশ্বাসের অবস্থার উন্নতিসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদান করে। 

 

জয়ত্রী

জয়ত্রী দেহের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে। এটি বিষণ্ণতা হ্রাস, যৌন কামনা বৃদ্ধি, হজম করা, অতিরিক্ত গ্যাস এবং অনিদ্রা কমাতে ভূমিকা রাখে। এটি ত্বককে সুস্থ রাখতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি চুলের স্বাস্থ্য উন্নত করে। শরীরের সমস্ত অংশে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।

সরিষা বীজ

এতে রয়েছে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সের একটি চমৎকার উৎস, যা অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজনীয়।

 

জায়ফল

জায়ফল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন, এবং স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজের উৎস। এটি ফাঙ্গাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। একই সাথে হজম শক্তি বৃদ্ধিতে, অতিরিক্ত গ্যাস কমাতে, চুল এবং ত্বকের স্বাস্থ্য উন্নত করতে ভূমিকা রাখে। এটি ম্যাকুলার ডিজেনেরেশন প্রতিরোধে সাহায্য করে এবং ক্যান্সার বৃদ্ধির সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

জাফরান

জাফরানের রয়েছে ক্যারোটিনয়েড। জাফরান বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ, নিদ্রাহীনতা, রক্তের কোষ গঠনে সহায়তা করে। হরমোনের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং জাফরান রক্তচাপ কমাতেও সাহায্য করে।

 

হলুদ

মশলার মধ্যে সব থেকে সাধারণ এবং বেশি ব্যবহৃত মসলার নাম হলুদ। হলুদ সাধারণত অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি গুণাবলির জন্য সুপরিচিত। এটি ত্বকের যত্নে সহায়তা করে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। এটি ঋতুস্রাব স্বাভাবিক ও সহজ করে দেয় এবং দেহকে সক্রিয় করে তোলে।

 

‌‌কালিজিরা

কালিজিরাতে রয়েছে বিভিন্ন গুণের সংমিশ্রণ। হৃদরোগের জন্য কালিজিরা অত্যন্ত উপকারী। আমরা বিভিন্ন রান্নায় কালিজিরা ব্যবহার করে থাকি। এটি আমাদের হৃদরোগ ভালো করতে সাহায্য করে এবং আমাদের হার্টকে বিভিন্ন ধরনের রোগ থেকে রক্ষা করে। এছাড়াও কালিজিরা চুলের উপকারিতার জন্য ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। এটি চুলের বৃদ্ধি এবং গজানোতে বেশ কার্যকর।

মশলার গুণাগুণ তো জানা হলো, কিন্তু সব মশলা থেকেই এই উপকারিতা মিলবে ভাবছেন না তো? মশলা থেকে এইসব উপকারিতা পেতে চাই খাঁটি মশলা। তাই ক্রয় করার পূর্বে এর গুণগত মান সম্পর্কে অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে তবেই কিনবেন যেনো। 

Leave a Reply