চিকেন তান্দুরি নিয়ে রসালো আলাপ

Posted by Khaas Food

খাদ্যরসিকদের কাছে চিকেন হল এক দারুণ জিনিস! কাজে যেমন অলরাউনডার, স্বাদে তেমনই অতুলনীয়! যদি তেমন করে রাঁধা যায়, তবে চিকেন দিয়ে রাঁধা যেকোনো আইটেমই হয়ে ওঠে দারুণ মুখরোচক। একইসাথে প্রাণীজ প্রোটিনের বেশ ভালো এবং স্বাস্থ্যকর উৎস হওয়ায় সকলেরই প্রিয় চিকেন। 

তবে কিছু কিছু সময় ‘চিকেন’ শুধু স্বাদে দারুণ কিংবা স্বাস্থ্যের জন্যই ভালো নয়, কিছু কিছু সময় ‘চিকেন’ শব্দটা শুনতেও ভালো লাগে! যেমন ধরুন চিকেন’এর সাথে যখন তান্দুরি আসে! 

বলছি চিকেন তান্দুরির কথা! শুনতেই জিভে জল চলে এলো না? আসার মতনই একটা লোভনীয় আইটেম এটি! দিনের কিংবা রাতের যেকোনো সময়, যেকোনো অবস্থায় ‘চিকেন তান্দুরি’ শুনলে খেতে মন চাইবে না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর! 

অনেকেই মনে করেন চিকেন তান্দুরি আর গ্রিলড চিকেন বোধহয় একই রকমেরই কোন খাবার; অনেকের কাছে আবার চিকেন তান্দুরির একটা আধুনিক ও পশ্চিমা ভার্শন হল গ্রিলড চিকেন! তবে যেমনটা নামে বোঝা যায়, এদের মাঝে প্রস্তুতি, স্বাদ, গন্ধ এবং ফ্লেভারে যথেষ্টই পার্থক্য রয়েছে! একটা তৈরি হয় শুধুমাত্র কিছু মসলা মাখিয়ে গ্রিলে ঝুলিয়ে, অন্যটা তৈরি হয় দই ও স্পেশাল কিছু মসলায় বেশ অনেকক্ষণ রাখার পর তাকে গরম কয়লার তন্দুরে রান্না করার মাধ্যমে! 

এই ক্ষেত্রেই চিকেন তান্দুরির বিশেষত্ব! ‘তন্দুর’ বা ‘তন্নুর’ এক ধরণের বিশেষ সিলিন্ডারমত চুলা যা অনেক আগে থেকেই ব্যবহৃত হয় দক্ষিণপশ্চিম এবং মধ্য এশিয়ায়। আফগান, পাঞ্জাবি, আমেরিকান তন্দুর জায়গায় জায়গায় ও কালে কালে আলাদা আলাদা রূপ ধরলেও এর মূল কাজের প্রক্রিয়াটা একই ড়য়ে গেছে। কয়লা কিংবা কাঠ পোড়া তাপেই এর মধ্যে রান্না হয় তন্দুর নান থেকে শুরু করে নানান আইটেম। এই পোড়া ঘ্রাণটা এর ভেতরে তৈরি হওয়া খাবারকে দেয় একটা আলাদা ঘ্রাণ ও ফ্লেভার, যেটা অন্য কোনভাবেই আনা সম্ভব না। 

চিকেন তান্দুরিও একইভাবে জনপ্রিয় এর অন্যরকম স্বাদ ও বৈশিষ্ট্যের জন্য! তবে কত পুরানো এই চিকেন তান্দুরি?

চিকেন তান্দুরি সবাই চিনলেও অনেকেই জানেন না যে প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগে হড়প্পান সমাজে তন্দুর এবং এতে রাঁধা মুরগির মাংসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা প্রস্তুতিতে অনেকটাই চিকেন তান্দুরির মতই! 

জী, এতই পুরানো আমাদের প্রিয় চিকেন তান্দুরি! 

তবে চিকেন তান্দুরিকে একটি লোভনীয় খাবারের পদ হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলা বা এই মহান খাবারকে দেশ-বিদেশে  সুপরিচিত করার পেছনের মহানায়ক হিসেবে ধরা হয় পাঞ্জাবের পেশাওয়ারের কুন্দনলাল গুজরাল নামক এক বাবুর্চিকে যিনি নাকি ১৯৪৭ এ ব্রিটিশরা এ মুলুক ছেড়ে যাবার পর দিল্লীর দরিয়াগঞ্জে মোতি মহল নামে এক দোকান খোলেন। সেই রেস্তোরাঁতেই পাওয়া যেতো কুন্দনলালের তৈরি বিখ্যাত চিকেন তান্দুরি। 

জানা যায় এই মোতি মহল নাকি সেসময় ধীরে ধীরে এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে নেহরু থেকে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধী, জন এফ কেনেডি, রিচার্ড নিক্সন কিংবা ইরানের শেষ রাজা মহম্মদ রেজা শাহ পাহলভিও নাকি এই মোতি মহলে চিকেন তান্দুরি খেতে গিয়েই নিজেদের পদধুলি রেখে গেছেন! 

এমনকি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বিশেষ পছন্দের কারণেই নাকি সেই সময় থেকেই সরকারি ভোজগুলোতে চিকেন তান্দুরি পরিবেশন করার প্রচলন হয়!  

পরে তো মোতি মহলের জনপ্রিয়তা ভারত ছাড়িয়ে আমেরিকা, ইউরোপে চলে গেল আর বিভিন্ন দেশ মিলে প্রায় ১২০টির মত শাখা তৈরি হল। গলির ছোট্ট রেস্তোরাঁ থেকে মোতি মহলকে গ্লোবাল চেইন করে তোলার কৃতিত্বটুকু যদিও মনীষ গুজরালের (কুন্দনলালের নাতি)। সেই থেকে পেশাওয়ারের মোতি মহলই হল চিকেন তান্দুরির জন্মস্থান আর কুন্দনলাল পরিচিত হলেন এই মহান খাদ্যশিল্পটির কারিগর! 

চিকেন তান্দুরি জনপ্রিয় কেন সেটা জানবার পূর্বশর্ত হল চিকেন তান্দুরির রেসিপিটি জানা। চলুন তবে একটু হাতে কলমে হেঁশেলের জট খুলি!

একেবারে স্রেফ সনাতন পদ্ধতিতে চিকেন তান্দুরি তৈরির জন্য প্রথমেই লাগবে 

বড় বড় ৪ পিস (১ কেজি মত) চিকেন

এক কাপ টক দই 

চিকেন তান্দুরি মসলা, ৪০ গ্রাম মত

টমেটো সস, ৩/৪ টেবিল চামচ

এক্ষেত্রে বলে রাখি চিকেন তান্দুরির মসলাটা কিন্তু বেশ স্পেশাল। তাই এতে অন্য আর কোন মসলা না দিলেও দিব্যি হয়ে যায়। তবে সাধারণত মুরগির পিস গুলো দই আর তান্দুরি মসলায় মাখানোর পরে নিজেদের স্বাদ ও পছন্দমত আবার গোলমরিচ, লাল মরিচের গুঁড়া, হলুদ, খাদ্যরং যোগ করা হয়। 

যত বেশিক্ষণ ম্যারিনেট করে রাখা যায় ততই ভালো।
ঘণ্টা দেড়েক ম্যারিনেট করে রাখবার পরে লম্বা লোহার রড বা এইজাতীয় কিছুতে মাংস সাজিয়ে চুলার উচ্চতাপে একে রান্না করতে হবে। সবচেয়ে ভালো এবং মূল স্বাদ পেতে হলে এই চুলাটি জ্বালাতে হবে কয়লা বা কাঠ দিয়ে। এটি মাংসে বিশেষ স্মোকি ফ্লেভারটা আনে। কতক্ষণ রান্না করতে হবে সেটি অবশ্যই আপনাকে আন্দাজ করে বুঝে নিতে হবে, তবে সেটা নির্ভর করবে আপনি কতখানি বাদামি বা পোড়াভাব করতে চান তার উপর। 

এছাড়াও তন্দুর চুলা ছাড়াও সাধারণ চুলা বা ইলেকট্রিক ওভেনেও সহজেই তৈরি করা যায় চিকেন তান্দুরি। শুধু একটু খেয়াল রাখতে হবে তাপমাত্রা কত, মাংসটা ভিতর পর্যন্ত ঠিক করে রান্না হচ্ছে কিনা এবং পুড়ে যাচ্ছে কিনা। 

আস্ত মুরগির তান্দুরি করারও চলন রয়েছে। সেক্ষেত্রে পিস হিসেবে যেভাবে ম্যারিনেট করে রাখতে হয় সেভাবে রেখে এরপরে শুধু ইলেকট্রিক ওভেনের রটিসেরি ফাংশন ব্যবহার করতে হবে। অথবা গ্রিলের/ধাতব রডের মধ্যে মুরগিটা ঝুলিয়ে তন্দুর অথবা যেকোনো কয়লার আগুনে ভালোভাবে ঝলসে নিতে হবে। 

এ তো গেল রান্না ও চুলার কথা। মাংসের সাথেও অনেকে আরও স্পাইসি করতে বা বিশেষ ফ্লেভার হিসেবে লেবু, মধু, আদা বাটা, রসুন বাটা, পেঁয়াজ বাটা, জয়ফল, পাপরিকা, গরম মসলা বা নানান পদের সস দিয়ে ম্যারিনেট করে রাখেন। এটা একদমই আপনার ব্যাক্তিগত পছন্দ আর ধাঁচের ব্যাপার। 

কিন্তু যেভাবেই বানানো হোক না কেন, পরিবেশনের সময় চিকেন তান্দুরির সাথে গরম চুলা থেকে বের করা নান কিংবা ধোঁয়া ওঠা গরম পরোটা আর তার সাথে একটু টক ঝাল সালাদ, ব্যস, জবরদস্ত একটা আইটেম! দুপুরের মেইন ডিশ হোক কিংবা বিকেলের নাস্তা, সন্ধ্যার আয়োজন হোক কিংবা রাতের খাবার; কোন বেলাতেই উদরপূর্তিতে চিকেন তান্দুরির জুড়ি নেই!  

চিকেন তান্দুরি অ্যাপেটাইজার, স্টার্টার বা মেইন ডিশ হিসেবে খাওয়া হয়। অন্যান্য বিভিন্ন ফ্যাটযুক্ত আইটেম যেমন বাটার চিকেনের মূল হিসেবেও চিকেন তান্দুরি ব্যবহার করা হয়। বহুল জনপ্রিয়তার সুবাদে এবং দেশ বিদেশে বিভিন্নভাবে গ্রহণযোগ্যতার কারণে কালে কালে, দেশে দেশে চিকেন তান্দুরিকে বদলাতে হয়েছে যার যার রুচিমত। তবে প্রায় সব ধরণের চিকেন তান্দুরি পুদিনা পাতার সস কিংবা দই-শশার সসের সাথে পরিবেশন করলে তার রসে ছেলে বুড়ো সবাই মুগ্ধ হবেই! 

চিকেন তান্দুরির রহস্যের জট তো আমরা খুলেই ফেললাম! এবার তাহলে ঘরেই নানানভাবে চিকেন তান্দুরি বানিয়ে সবাইকে চমকে দেওয়ার পালা, তাই তো? 

 

শেয়ার করুন: