খাদ্যের গুনাগুণ

কালোজিরা খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা – প্রকৃতির অলৌকিক বীজ

কালোজিরা খাওয়ার উপকারিতা

শিমুর ঠান্ডা লেগে নাক বন্ধ, মাথাটাও কেমন ভার ভার লাগছে। কোন কিছুতেই আরাম মিলছে না। হঠাৎ তার দাদীর কথা মনে পরে গেলো, ছোটবেলায় যখনই এমন অবস্থা হতো দাদী পাতলা এক টুকরো কাপড়ে কিছুটা কালোজিরা (Black Cumin) বেঁধে হাতের তালুতে ঘষে শিমুর নাকের কাছে ধরতো। কালোজিরার ঘ্রাণে তখন মনে হতো মাথাটা হালকা হয়ে গেছে, নাকও খুলে যেতো নিমিষেই। 

কালোজিরা – ক্ষুদ্র কালো বীজ, খানিকটা ঝাঁঝালো কিন্তু বড্ড কাজের মনে হয় শিমুর কাছে। কি যে আছে এতে কে জানে! 

শিমুর মতন এই অভিজ্ঞতা অনেকেরই কম বেশি আছে। বর্তমানে ঠান্ডার সমস্যার জন্য বিভিন্ন ধরনের ইনহেলার বের হলেও কালোজিরার জুড়ি মেলা ভার। শুধুই কি ঠান্ডার সমস্যা, এই ছোট্ট দানার ভিতর লুকিয়ে আছে আরও অনেক ঔষধি গুণাগুণ। সেজন্যই তো হাদিসে আছে, আয়িশা (রা:) বর্ণিত, নবীজি (সা:) বলেছেন “কালোজিরা ‘সাম’ (মৃত্যু) ব্যতীত সকল রোগের ঔষধ।” 

কালোজিরার পুষ্টিমান :

প্রতি ১০০গ্রাম কালোজিরা তে আছে – 

  • প্রোটিন : ২২ গ্রাম
  • ফ্যাট : ৪১ গ্রাম 
  • কার্বোহাইড্রেট : ১৭ গ্রাম
  • ফাইবার : ৮ গ্রাম 
  • আয়রন : ১০ মি.গ্রা 
  • থায়ামিন (ভিটামিন বি১) : ১.৫ মি.গ্রা
  • নায়াসিন (ভিটামিন বি৩) : ৬ মি.গ্রা 
  • টোকোফেরল : ৩৪ মি.গ্রা 

কালোজিরার প্রধান একটি উপাদান হচ্ছে থাইমোকুইনোন যা একে অন্যান্য ঔষধি মসলা বা গাছ থেকে আলাদা করে। এই থাইমোকুইনোন মূলত একাধারে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি, অ্যান্টিকারসিনোজেন, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল গুণাবলি ধারণ করে। একসাথে এতোগুলা বৈশিষ্ট্য খুব কম খাবারেই দেখা যায়। 

কালোজিরা খাওয়ার উপকারিতা ও অপ্রতিরোধ্য গুণাবলি :

প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি কালোজিরা সমাদৃত হয়ে আসছে এর চমৎকার সব ঔষধি গুণাগুণ এর জন্য। নিত্য নতুন গবেষণায় প্রকাশ পাচ্ছে এর অভাবনীয় স্বাস্থ্য গুণ যা এই বীজকে করে তুলছে আরও বিস্ময়কর। কী সেই গুণাবলি? চলুন জেনে নেই…

১। অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন : এতে রয়েছে থাইমোকুইনোন যা একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই থাইমোকুইনোন কোষের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং শরীরের প্রদাহ কমাতে সক্ষম। কোষের এই অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ বিভিন্ন ধরনের রোগের বার্তা দেয়। আর কালোজিরা এই অবস্থার উন্নতি করতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। 

২। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল গুণ সম্পন্ন : কালজিরা একাধারে ব্যাকটেরিয়া এবং ফাঙ্গাস জনিত সমস্যার বিপরীতে লড়াই করতে সক্ষম। বিভিন্ন সময়ে করা গবেষণায় উঠে এসেছে গ্রাম পজিটিভ এবং গ্রাম নেগেটিভ – উভয় ধরনের ব্যাকটেরিয়ার উপরই কালোজিরা কার্যকরী ভূমিকা রাখে। একই সাথে এতে দু’টি প্রধান অ্যান্টিফাঙ্গাল ডিফেন্সি আছে যা ফাঙ্গাস জনিত আক্রমণক্র প্রতিহত করতে সক্ষম। 

৩। রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখে : গবেষণায় দেখা গিয়েছে কালোজিরা ডায়াবেটিক অবস্থায় কার্বোহাইড্রেট মেটাবলিজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সাথে এতে উপস্থিত বিভিন্ন উপাদান, বিশেষত থাইমোকুইনোন রক্তের বাড়তি গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণেও কাজ করে৷ কালোজিরার নির্যাস খালি পেটে এবং খাবার ২ ঘন্টা পরে – উভয় ক্ষেত্রেই শর্করা কমাতে কার্যকরী। একই সাথে প্যানক্রিয়াসের বিটা সেল যা মূলত ইনসুলিন ক্ষরণ করে, তা পুনরুজ্জীবিত করতেও ভূমিকা রাখে। 

৪। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখে : কালোজিরায় উপস্থিত থাইমোকুইনোন ক্যান্সার কোষগুলোর বৃদ্ধিকে স্তিমিত করে দেয়। ফলে ক্যান্সার কোষ ছড়ানোর প্রক্রিয়াটি বাঁধাপ্রাপ্ত হয়। 

৫। আলসার প্রতিরোধে কার্যকরী : কালোজিরাতে বিদ্যমান থাইমোকুইনোন পাকস্থলীতে গ্যাস্ট্রিক মিউসিন এর ক্ষরণ বৃদ্ধি করে। একই সাথে এটি আলসার বা ক্ষত নিরাময় প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এমনকি পেপটিক আলসারের পাশাপাশি কালোজিরা গ্যাস্ট্রাইটিস, ডিসপেপসিয়া এবং অ্যাসিড রিফ্লাক্স উপশমেও কার্যকরী বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসে। 

৬। ফ্যাটি লিভার সমস্যায় কার্যকরী : গবেষণায় উঠে এসেছে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD) তে নির্দিষ্ট মাত্রায় কালোজিরা সেবন করলে তা লিভারের প্রদাহ অনেকাংশেই কমাতে সক্ষম। একই সাথে এটি লিভারের ফ্যাট জমার প্রবণতা কিছুটা কমাতে কাজ করে। 

৭। হাইপারলিপিডেমিয়া উত্তরণে : রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড, এলডিএল তথা ফ্যাট যখন বাড়তি থাকে তখন সেই অবস্থাকে হাইপারলিপিডেমিয়া হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই হাইপারলিপিডেমিয়া রোগীদের উপর করা গবেষণায় দেখা যায়  কালোজিরার ব্যবহার এদের রক্তের এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরল বৃদ্ধিতে কাজ করে। আর এই এইচডিএল রক্তের অতিরিক্ত ট্রাইগ্লিসারাইড এবং এলডিএল এর মাত্রা কমাতে কাজ করে। এমনকি ধূমপায়ী এবং মেটাবলিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মাত্রার কালোজিরা সেবনে রক্তের ফ্যাটের মাত্রা কমে আসে বলে উঠে এসেছে গবেষণায়। 

৮। উচ্চরক্তচাপ কমায় : দীর্ঘদিন ধরে উচ্চরক্তচাপ জনিত সমস্যায় ভূগছেন এমন রোগীদের ক্ষেত্রে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে নিয়মিত ভাবে নির্দিষ্ট মাত্রায় কালোজিরার তেল বা নির্যাস বেশ কার্যকরী। 

৯। ফুসফুসের রোগে কার্যকরী : ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ যেমন, অ্যাজমা, পালমোনারি ফাইব্রোসিস, অ্যাকিউট লাঙস ইঞ্জুরি বা ফুসফুসের ক্যান্সারে  প্রদাহ এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে কাজ করে কালোজিরা।

১০। প্রজননতন্ত্রের জন্য উপকারী : কালোজিরার তেল প্রজননতন্ত্রের জটিলতা কমাতে বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে ভালো কাজ করে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। কালোজিরায় উপস্থিত থাইমোকুইনোন পুরুষদের টেস্টিকুলার স্পার্মাটোজেনেসিস, সিমেন প্যারামিটার এবং সিমেন ভেসিকল ডেভেলপমেন্ট এর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটায় যা তাদের প্রজননক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে। আবার পুরুষালি হরমোন বা টেস্টোস্টেরনের লেভেল বৃদ্ধিতেও কালোজিরা ভূমিকা রাখে। 

১১। আর্থ্রাইটিসের জন্য উপকারী : কালোজিরায় উপস্থিত থাইমোকুইনোন এর অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণাবলির জন্য এটি হাড়ের জয়েন্টে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমানোর মাধ্যমে প্রদাহ কমাতে ভূমিকা রাখে। কালোজিরার তেল ব্যথার জায়গায় মালিশ করার মাধ্যমে অনেকটা আরাম বোধ হয়। তবে এর সাথে অবশ্যই আর্থ্রাইটিসের জন্য নিয়মিত ভাবে ঔষধ সেবন করতে হবে। 

১২। ত্বকের সুরক্ষায় : কালোজিরার তেল বা কালোজিরা থেকে তৈরি জেল ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা, যেমন- সোরিয়াসিস, ব্রণ, পুড়ে যাওয়া বা ক্ষত সারাতে ভূমিকা রাখে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। ত্বকের কালচে ভাব দূর করতে বা রোদে পোড়া ত্বকের উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনতেও কার্যকরী। 

কালোজিরা খাওয়ার অপকারিতা :

১। নিম্ন রক্তচাপ এর রোগীদের ক্ষেত্রে: উচ্চরক্তচাপ জনিত সমস্যায় কালোজিরা উপকারী হলেও যাদের রক্তচাপ প্রায়শই স্বাভাবিক অপেক্ষা কম থাকে বা হঠাৎ করে কমে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকে তাদের ক্ষেত্রে কালোজিরা হিতে বিপরীত হতে পারে। কালোজিরাতে উপস্থিত থাইমল ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকেজ এর মাধ্যমে রক্তচাপ কমিয়ে ফেলতে পারে। তাই নিম্ন রক্তচাপ এর রোগীদের কালোজিরা সেবনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। 

২। গর্ভাবস্থায় : গর্ভাবস্থায় কালোজিরা জরায়ু সংকোচন ঘটাতে পারে, বিশেষত যদি অতিমাত্রায় সেবন করতে হয় সেক্ষেত্রে। তাই এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ব্যতীত গ্রহণ করা অনুচিত। এছাড়াও গর্ভপাতের ঝুঁকিও থেকে যায়। 

দৈনিক কতটা গ্রহণ নিরাপদ? 

দৈনিক ১ চা চামচ বা ৫ গ্রাম পর্যন্ত কালোজিরা গ্রহণ কে নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর কালোজিরা তেলের ক্ষেত্রে গ্রহণ মাত্রা ১ থেকে ১০ মি.লি এর বেশি হওয়া অনুচিত। 

কালোজিরার সাথে ওজন নিয়ন্ত্রন কি সম্পর্কিত?

বিভিন্ন গবেষণা থেকে উঠে এসেছে নিয়মিত কালোজিরা সেবন করলে তা ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কালোজিরা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমাতে সক্ষম। একই সাথে কিছু মেটাবলিক রোগেও কালোজিরা কাজ করে যেগুলো বাড়তি ওজনের জন্য দায়ী। তাই কালোজিরা পরোক্ষভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণের সাথে সম্পর্কযুক্ত।  

কালোজিরা খাওয়ার পদ্ধতি :

গোটা কালোজিরা (Black Cumin) সরাসরি চিবিয়ে খাওয়া যায়। একই সাথে তরকারি বা সবজিতে কালোজিরার ফোড়ন দেওয়া যায়। এছাড়া কালোজিরার তেল সেবনেও উপকার মিলে। 

কালোজিরা প্রকৃতির দেওয়া এক অমূল্য সম্পদ। এটি নিয়ে করা বিভিন্ন গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে কালোজিরা সুস্বাস্থ্যের জন্য এক অনবদ্য উপাদান। তবে অবশ্যই এর সেবন মাত্রা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। কেননা ভুল ব্যবহারে এই মহৌষধ হতে পারে জীবন ঝুঁকির কারন।

Leave a Reply